![]() |
| ফাইল ফুটেজ |
বিশেষ প্রতিবেদন: আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি—বিপ্লবী ছাত্র থেকে আধুনিক ইরানের সর্বোচ্চ নেতা
নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬
তেহরান/ঢাকা: বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যে কজন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ বদলে দিয়েছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তাঁদের অন্যতম। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানের ভাগ্য নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি তাঁর জীবনকাহিনী গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় ভরপুর।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষার হাতেখড়ি
আলী হোসাইনি খামেনি ১৯৩৯ সালে ইরানের পবিত্র নগরী মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন। এক ধার্মিক পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে খুব অল্প বয়সেই তিনি ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হন। নাজাফ এবং কোমের মতো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাকেন্দ্রে তিনি ইসলামি ফিকহ ও দর্শনে উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করেন। কোমে অবস্থানকালেই তিনি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সংস্পর্শে আসেন, যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড ও দীর্ঘ কারাবাস
১৯৬০-এর দশকে ইরানের তৎকালীন শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর পশ্চিমাঘেঁষা নীতি ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে খামেনি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি ছিলেন আয়াতুল্লাহ খোমেনির অন্যতম বিশ্বস্ত অনুসারী। এই বিপ্লবে সম্পৃক্ততার কারণে তাঁকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে। সাভাক (শাহের গোপন পুলিশ) তাঁকে কয়েকবার নির্বাসনেও পাঠিয়েছিল। তবে প্রতিটি কারাবাস তাঁকে মানসিকভাবে আরও দৃঢ় করে তোলে।
বিপ্লব পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনা
১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের সফলতার পর খামেনি নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে শক্ত হাতে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি সবার নজর কাড়েন।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে অভিষেক
১৯৮৯ সালে ইমাম খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ (Assembly of Experts) আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে 'সুপ্রিম লিডার' বা সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত করে। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই পদে আসীন আছেন। তাঁর শাসনামলে ইরান পারমাণবিক প্রযুক্তি, সামরিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে।
রাজনৈতিক দর্শন ও বিশ্বরাজনীতি
খামেনির শাসনের প্রধান স্তম্ভ হলো পশ্চিমা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি তাঁর আপসহীন নীতি ইরানকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে ফেললেও, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে দেশটিকে এক মহাশক্তিতে পরিণত করেছে। সিরিয়া, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনে ইরানের বর্তমান প্রভাব তাঁরই দূরদর্শী রণকৌশলের ফল।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ইতিহাস কেবল একজন ব্যক্তির ইতিহাস নয়, বরং তা একটি জাতির আদর্শিক লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। সমালোচনা এবং বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তিনি ইরানকে একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন।
তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও ঐতিহাসিক নথিপত্র।

0 Comments