![]() |
|
হাম (Measles) কেবল একটি সাধারণ জ্বর বা র্যাশ নয়, এটি শিশুর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে দুর্বল করে দেয়। তাই এই সময়ে সঠিক চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন বিশেষ যত্ন। শিশুর দ্রুত সুস্থতা নিশ্চিত করতে এবং জটিলতা এড়াতে বাবা-মায়েরা যা করতে পারেন:
১. আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করুন
হামের সময় শিশুর চোখ অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে (Photophobia)। তাই শিশুর ঘরটি পরিষ্কার, শান্ত এবং মৃদু আলোযুক্ত রাখুন। সরাসরি কড়া আলো চোখের অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
২. পানিশূন্যতা রোধে তরল খাবার
জ্বরের কারণে শিশুর শরীর থেকে প্রচুর পানি বেরিয়ে যায়। পানিশূন্যতা এড়াতে শিশুকে বারবার পানি, ডাবের পানি, ঘরের তৈরি ফলের রস বা পাতলা সুপ খাওয়ান। বুকের দুধ খাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে বারবার দুধ পান করানো চালিয়ে যেতে হবে।
৩. পুষ্টিকর ও নরম খাবার
মুখে ঘা হওয়ার কারণে শিশু খাবার খেতে চায় না। এই সময়ে জোর করে শক্ত খাবার না খাইয়ে খিচুড়ি, সুজি বা নরম জাউ ভাত অল্প অল্প করে বারবার দিন। মনে রাখবেন, পুষ্টিই শিশুর শরীরকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করবে।
৪. র্যাশ বা ফুসকুড়ির যত্ন
শরীরের র্যাশগুলো চুলকালে সেখানে ক্ষত হতে পারে। তাই শিশুর নখ ছোট করে কেটে দিন। চুলকানি কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে ক্যালামাইন লোশন ব্যবহার করা যেতে পারে। শরীর মোছানোর সময় হালকা গরম পানি ব্যবহার করুন।
৫. ভিটামিন-এ (Vitamin A) এর গুরুত্ব
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে, হামের জটিলতা যেমন—নিউমোনিয়া বা অন্ধত্ব রোধে ভিটামিন-এ অত্যন্ত কার্যকর। আপনার নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগাযোগ করে বা চিকিৎসকের পরামর্শে শিশুকে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর ব্যবস্থা করুন।
৬. জটিলতার লক্ষণ চিনুন (কখন হাসপাতালে নিবেন?)
যদি দেখেন শিশুর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, কান দিয়ে পুঁজ পড়ছে, প্রচণ্ড ডায়রিয়া হচ্ছে কিংবা শিশু নেতিয়ে পড়ছে—তবে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান।
৭. হামের জ্বরে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ
হামের জ্বরে শরীর অনেক সময় ১০৩ থেকে ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত গরম হতে পারে। এই সময় শুধু ওষুধ নয়, জলপট্টি বা ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছিয়ে দেওয়া জরুরি। সাধারণ তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করুন, খুব ঠান্ডা বা বরফ পানি ব্যবহার করবেন না। শিশুর গায়ে ভারী কাপড় বা লেপ-কম্বল চেপে দেবেন না, বরং পাতলা সুতি কাপড় পরিয়ে রাখুন।
৮. চোখের বিশেষ সেবা ও পরিচ্ছন্নতা
হামের সময় শিশুর চোখ থেকে পিঁচুটি বা ময়লা বের হতে পারে। এই সময় পরিষ্কার তুলা বা নরম সুতি কাপড় কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে আলতো করে শিশুর চোখ মুছে দিন। প্রতিটি চোখের জন্য আলাদা তুলা ব্যবহার করুন যাতে একটির সংক্রমণ অন্যটিতে না ছড়ায়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের আই ড্রপ ব্যবহার করবেন না।
৯. ঘরোয়া ও সামাজিক সচেতনতা
হাম একটি বায়ুবাহিত রোগ যা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়ায়। তাই আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে কমপক্ষে ৭-১০ দিন আলাদা ঘরে বা আইসোলেশনে রাখুন। শিশুর ব্যবহৃত থালাবাসন, তোয়ালে এবং বিছানার চাদর আলাদা রাখুন। সেবাকারী ব্যক্তিকেও নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে। সংক্রমণের ভয় থাকলে শিশুকে স্কুলে বা বাইরে খেলতে পাঠাবেন না।
১০. সুস্থ হওয়ার পরবর্তী যত্ন
হামের র্যাশ চলে যাওয়ার পর শিশুর শরীর অনেক দুর্বল থাকে এবং ওজন কমে যেতে পারে। তাই পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ শিশুকে বাড়তি প্রোটিন এবং ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবার দিন। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনরায় ফিরে পেতে নিয়মিত ডিম, দুধ এবং রঙিন শাকসবজি খাওয়া নিশ্চিত করুন।
সতর্কবার্তা: হাম একটি অতি সংক্রামক রোগ। তাই আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে অন্তত ৭-১০ দিন আলাদা রাখুন এবং ব্যবহৃত কাপড় ও থালাবাসন গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করুন।
হামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সঠিক ঘরোয়া যত্ন এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ শিশুর সুস্থতার মূল চাবিকাঠি। সচেতন বাবা-মা হিসেবে আপনার ছোট ছোট পদক্ষেপই পারে শিশুর বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে দিতে। নিজেকে এবং আপনার শিশুকে নিরাপদ রাখতে টিকার ওপর গুরুত্ব দিন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।
"হামের প্রাথমিক লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জানতে আমাদের [হামের লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধের সঠিক নিয়ম: আপনার শিশুকে নিরাপদ রাখবেন যেভাবে] এই আর্টিকেলটি পড়ুন।"

0 Comments